ঢাকা

No edit

সংবাদ শিরোনাম ::
ঢাকাঃ

No edit

সংবাদ শিরোনাম ::
Header Ads

ইসলামপুরের দুই ভাইয়ের ভোটার ঠিকানা বদলে গেল অজান্তেই, সুরাহা পেতে দপ্তরে দপ্তরে

ইসলামপুরের দুই ভাইয়ের ভোটার ঠিকানা বদলে গেল অজান্তেই, সুরাহা পেতে দপ্তরে দপ্তরে
প্রকাশঃ
প্রসেসিং হচ্ছে, দয়া করে অপেক্ষা করুন...
অ+ অ-
আসমাউল আসিফ, স্টাফ রিপোর্টার:

জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার একই গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেইজ অনুযায়ী ভোটার তালিকায় ঠিকানা স্থানান্তর হয়ে গেছে দুই সহোদর ভাইয়ের। বর্তমানে তারা পাশের মেলান্দহ উপজেলার দুটি গ্রামের বাসিন্দা ও ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। আবেদন না করেও নিজেদের অজান্তে ভোটার এলাকা স্থানান্তর হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ওই দুই ভাই।

তাদের অভিযোগ, কে বা কারা বিভিন্ন জাল কাগজপত্র ও ভুয়া তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে বেআইনিভাবে তাদের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন। প্রকৃত ঠিকানায় ভোটার এলাকা ফিরিয়ে দেওয়া এবং জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের ঠিকানা দ্রুত আগের ঠিকানায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তারা।

জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার চর গোয়ালিনী ইউনিয়নের পূর্ব কান্দারচর গ্রামের মৃত আব্দুল করিমের ছেলে সহোদর দুই ভাই মো. মিলন মিয়া (৩৯) ও মো. নুরনবী শেখ (৩৬)। তারা ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। সেখানেই তাদের বসতভিটা ও জীবন-জীবিকা। পেশায় ব্যবসায়ী দুই ভাই চর গোয়ালিনী ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের ভোটার।

মো. মিলন মিয়ার ছোট ভাই মো. নুরনবী শেখ ২০২১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চর গোয়ালিনী ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডে ইউপি সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। স্থানীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে তারা নিজেদের নির্বাচনী কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আসছেন।

কিন্তু সম্প্রতি তাদের অজান্তে ভোটার এলাকা স্থানান্তর হয়ে গেছে। দুই ভাইয়ের অভিযোগ, এলাকা পরিবর্তনের জন্য তারা কোনো আবেদন করেননি। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ছোট ভাই মো. নুরনবী শেখ আবারও ইউপি সদস্য পদে প্রার্থী হবেন। তাই তাদের ভোটার এলাকা পরিবর্তনের কোনো প্রশ্নই আসে না বলে দাবি তাদের।

তাদের অভিযোগ, অজান্তেই কে বা কারা মেলান্দহ উপজেলার দুরমুঠ ইউনিয়ন পরিষদ ও মেলান্দহ উপজেলা নির্বাচন অফিসের সংশ্লিষ্টদের মধ্যস্থতায় তাদের ভোটার এলাকা স্থানান্তর করেছেন।

মেলান্দহ উপজেলা নির্বাচন অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ২০ জুলাই ওই দুই ভাইয়ের স্বাক্ষর জাল করে ভোটার এলাকা স্থানান্তরের জন্য পৃথক আবেদন করা হয়। আবেদনের সঙ্গে ভোটার এলাকা স্থানান্তরের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও সংযুক্ত করা হয়। এক মাস পর ২০ আগস্ট আবেদনটি মেলান্দহ উপজেলা নির্বাচন অফিসে গৃহীত হয়। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই শেষে ২৫ আগস্ট মেলান্দহ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ কামরুল হাসান তা ইস্যু করে ইসলামপুর উপজেলা নির্বাচন অফিসে পাঠান।

এরপর গত ৩০ আগস্ট ইসলামপুর উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে মেলান্দহ উপজেলা নির্বাচন অফিসে ভোটার স্থানান্তর চূড়ান্ত হয়। সেদিন থেকেই বড় ভাই মো. মিলন মিয়া মেলান্দহের দুরমুঠ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জাঙ্গালিয়া গ্রামের এবং ছোট ভাই মো. নুরনবী শেখ একই ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের হাতিজা গ্রামের বাসিন্দা ও ভোটার হিসেবে গণ্য হন।

ঘটনার কয়েক দিন পর বিষয়টি জানতে পারেন দুই ভাই। এরপর সুরাহা পেতে তারা সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে যান। আবেদনের সঙ্গে দেওয়া কাগজপত্র ও প্রমাণাদি যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, মেলান্দহ উপজেলার দুরমুঠ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এসব কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। দুই ভাই ওই এলাকার বাসিন্দা না হয়েও কীভাবে দুরমুঠ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নাগরিক সনদ, ভূমি কর, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের কাগজসহ অন্যান্য নথি সংগ্রহ করে নির্বাচন অফিসে আবেদন করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মেলান্দহ উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে সংগ্রহ করা আবেদনে দেখা যায়, বড় ভাই মো. মিলন মিয়ার ভোটার এলাকা স্থানান্তরের আবেদনে শনাক্তকারী হিসেবে সিলসহ স্বাক্ষর করেছেন দুরমুঠ ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আ. করিম বাবুল। তবে শনাক্তকারী হিসেবে একই ইউনিয়নের হামলা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ নামে এক ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে।

আবেদনের সঙ্গে মো. মিলন মিয়া চার বছর ধরে দুরমুঠ ইউনিয়নের জাঙ্গালিয়া গ্রামে বসবাস করছেন—এমন একটি প্রত্যয়নপত্রও রয়েছে। এতে ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আ. করিম বাবুলের সঙ্গে যৌথভাবে স্বাক্ষর করেছেন একই ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মোছা. আমেনা বেগম। তার নাগরিক সনদে স্বাক্ষর করেছেন ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের আরেক সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মোছা. পারভীর সুলতানা। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বসতবাড়ির ২০০ টাকা কর পরিশোধের একটি রসিদ এবং হামলা গ্রামের মো. রফিকুল ইসলামের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের কাগজও সংযুক্ত করা হয়েছে।

অপরদিকে, ছোট ভাই মো. নুরনবী শেখের ভোটার এলাকা স্থানান্তরের আবেদনে শনাক্তকারী হিসেবে সিলসহ স্বাক্ষর করেছেন একই ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. অলিল আহম্মেদ। তবে শনাক্তকারী হিসেবে মো. নুরনবীর চাচাতো ভাই পরিচয়ে একই ইউনিয়নের পূর্ব হাতিজা গ্রামের মো. তৈয়ুব আলীর জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া তিনি দীর্ঘ আট বছর ধরে ওই ইউনিয়নের হাতিজা গ্রামে বসবাস করছেন—এমন একটি প্রত্যয়নপত্রে ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. অলিল আহম্মেদের সঙ্গে যৌথভাবে স্বাক্ষর করেছেন ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মোছা. পারভীর সুলতানা। তার নাগরিক সনদে স্বাক্ষর করেছেন ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. অলিল আহম্মেদ। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বসতবাড়ির ২০০ টাকা কর পরিশোধের একটি রসিদ এবং হাতিজা গ্রামের মো. আকবরের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের কাগজও সংযুক্ত করা হয়েছে।

পুনরায় আবেদনের পর দ্রুত তাদের প্রকৃত ঠিকানায় ভোটার এলাকা স্থানান্তরের আশ্বাস মিললেও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী দুই ভাই।

মো. মিলন মিয়া বলেন, “আমি ইসলামপুর উপজেলার চর গোয়ালিনী ইউনিয়নের কান্দাচর ২ নং ওয়ার্ডের একজন স্থায়ী বাসিন্দা। আমি এবং আমার ছোট ভাই নুরনবী—দুজনেরই মেলান্দহ উপজেলায় দুটি আলাদা গ্রামে ভোটার স্থানান্তর করা হয়েছে। কীভাবে হয়েছে বা কে করেছে, আমরা এ সম্পর্কে জানি না। আমাদের দাবি, আমাদের ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডে যেন আমাদের ভোটার এলাকা ফিরিয়ে আনা হয়। এ বিষয়ে আইনি সহায়তা চাই। পাশাপাশি যারা আমাদের হয়রানি করছে, তাদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছি।”

মো. নুরনবী শেখ বলেন, “ইসলামপুর উপজেলার চর গোয়ালিনী ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের কান্দাচর গ্রামে আমি ভোটার। আমার ভোটার এলাকা কীভাবে যেন পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমি গত ২০২১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইউপি সদস্য পদে নির্বাচন করেছি। এবারও নির্বাচন করব। হঠাৎ জানতে পারি, কীভাবে যেন আমার ভোটার এলাকা স্থানান্তর হয়ে গেছে। এবার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছি। আমাকে দ্রুত মেলান্দহ থেকে ইসলামপুরে আগের ঠিকানা কান্দাচর ২ নং ওয়ার্ডে ভোটার এলাকা স্থানান্তরের জন্য আবেদন করেছি। যারা জালিয়াতি করে আমার নামে কাগজপত্র বানিয়ে এলাকা পরিবর্তন করেছে, তাদের আইনের আওতায় এনে সঠিক বিচার চাই।”

এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে দুরমুঠ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা প্যানেল চেয়ারম্যান মো. বিলাশ সরকার জানান, চেয়ারম্যান, প্যানেল চেয়ারম্যান অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধি ছাড়া নাগরিক সনদে স্বাক্ষর করার এখতিয়ার কারও নেই। কোনো কোনো ইউপি সদস্য জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। লিখিত অভিযোগ দিলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে মেলান্দহ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, অনেক মানুষের আবেদনের কারণে অফিসে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। তাড়াহুড়ার কারণে এত সূক্ষ্মভাবে যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয়নি। তবে কারও গাফিলতি থাকলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুনরায় আবেদন করলে দ্রুতই তাদের এলাকা স্থানান্তর করা হবে।

ইসলামপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান ভূইয়া বলেন, “ইসলামপুর উপজেলায় চার লাখ ভোটার। অনেক আবেদন আসে, সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া সম্ভব নয়। দু-একটি বিষয় এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে দুই ভাইয়ের বিষয়টি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত। যারা জড়িত, তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। ভুক্তভোগী দুই ভাই আবেদন করেছেন, খুব দ্রুতই তাদের ভোটার এলাকা স্থানান্তর সম্পন্ন হবে।”

মেলান্দহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিন্নাতুল আরা প্রতারকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পরামর্শ দিয়ে বলেন, “দুই ভাইয়ের অজান্তে ঠিকানা পরিবর্তন করে তাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।”

জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি এবং ভোটার এলাকা স্থানান্তর বা জাতীয় পরিচয়পত্রের অন্যান্য সংশোধনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা আরও সচেতন হবেন—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্ট সবার।

শিরোনাম...

একটি মন্তব্য করুন