ব্রহ্মপুত্র নদে ডুবে পাঁচ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু: ঝুঁকিপূর্ণ ভাসমান সেতুর সংযোগ চালু করল কারা?

স্টাফ রিপোর্টার: জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ভাসমান সেতু ভেঙে ব্রহ্মপুত্র নদে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো জানা যাচ্ছে না পেছনের কারন। স্থানীয়রা মনে করছেন- বন্ধ থাকা ঝুঁকিপূর্ণ এই ভাসমান সেতুটি হঠাৎ চালু করায় ঘটেছে এমন দূর্ঘটনা। এর পেছনে কারন খুজে বের করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি তাদের। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি সেই তিন পরিবারকে দেয়া হয়েছে আর্থিক সহায়তা।
শনিবার (২১ মার্চ) বিকাল ৪টার দিকে দেওয়ানগঞ্জ পৌর এলাকার মডেল থানার সামনে কালিকাপুর ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর প্লাস্টিক ড্রামের তৈরি ভাসমান সেতু ভেঙে এই দূর্ঘটনা ঘটে।
নিহত শিশুরা হলেন- দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ডাকাতিয়াপাড়া এলাকার জয়নাল আবেদীনের মেয়ে মায়া মনি (১০), তাঁর ছেলে মিহাত (১৪), বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের ঝালুরচর এলাকার শের আলীর ছেলে আব্দুল মোতালেব (৬), মেয়ে খাদিজা (১২) ও দেওয়ানগঞ্জ পৌর শহরের বেলতলি বাজার এলাকার হাবিবুল্লাহ’র ছেলে ৫ম শ্রেণীর ছাত্র আবির হোসেন (১৪)।
এ ঘটনায় শান্তি নামে এক শিশু আহত হয়ে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান- ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে চর কালিকাপুরে মালিহা ইকো পার্ক নামে পিকনিক স্পট,মিনি চিড়িয়াখানা ও শিশু পার্ক তৈরি করা হয়েছে। পার্ক কর্তৃপক্ষ পরিত্যক্ত সাঁকোর সামনে ঈদ উপলক্ষে পার্কে ঘুরে আসার বিলবোর্ড টাঙ্গিয়ে দেন। ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে বিকেল থেকেই ভিড় করে নানা বয়সীরা। বিকাল ৪ টায় সেতুর উপর দিয়ে পার্কে যাবার সময় অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে সেতুটি ভেঙ্গে যায়। এ সময় প্রায় শতাধিক মানুষ নদে ডুবে যায়। সকলে সাতরে পাড়ে উঠলেও ৫ শিশু নিখোঁজ থাকে। খবর পেয়ে জামালপুর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযান শুরু করে। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, বিএনপি নেতাকর্মী ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় পাঁচ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
জামালপুর ফায়ার সার্ভিষ স্টেশনের সিনিয়র অফিসার মোঃ রবিউল ইসলাম আকন্দ বলেন- “আমরা খবর পেেয় ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করি। আমরা রাত সাড়ে ১০ টা র্পযন্ত অভিযান করে ৫ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করি। আর কোন অভযিােগ না থাকায় উদ্ধার সমাপ্ত ঘোষনা করা হয়।”
এরপর রোববার (২২ মার্চ) নিহত শিশুদের নিজ নিজ এলাকায় জানাজার পর দাফন সম্পন্ন হয়। সেসময় শোকাহত পরিবার ও স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকাজুড়ে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া।
সোমবার সকালে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে প্রতিটি পরিবারকে স্থানীয় এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়।
এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতি মন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন- “ঘটনা জানার পরেই আমি স্পটে যায় এবং প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সহযোগতিায় উদ্ধার কাজ সম্পন্ন হয়। প্রতিটি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। আর ব্রহ্মপুত্র নদের উপর সেতু নির্মানের জন্য আমরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহন করছি।”
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার নিহত শিশুদের পরিবারের পক্ষ থেকে দোষীদের বিচারের দাবিতে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
নিহত মায়ামনি ও মিহাতের পিতা চর ডাকাতিয়া পাড়ার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন-“আমি ৩ ছেলে মেয়ে নিয়ে সেতুতে গিয়েছিলাম। দুই শতাধিক মানুষ সেতুতে উঠে পড়ে। আমি সেতুর অবস্থা খারাপ দেখে ওদের নিয়ে নামার সময় ১০/১৫ ছেলে সেতুতে উঠে পড়ে নাড়াচাড়া শুরু করে। মুহুর্তেই সেতু ভেঙ্গে যায়। আমি ছোট মেয়েকে নিয়ে ডুব দিয়ে পাড়ে উঠি। সবাই আমাকে ঝাঁপড়ে ধরে ছিল যেন আমিও মারা যাই। আমার ছেলে মিহাত আর মেয়ে মায়ামনিকে বাঁচাতে পারিনি। আমি সুষ্ঠু তদন্ত করে এর বিচার চাই।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন-“সেতুটির সংযোগ বন্ধ থাকলে হয়তো এই দূর্ঘটনা ঘটতো না। কে বা কারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ থাকা অবস্থায় এই সংযোগ চালু করে। সংযোগ চালুর জন্য এতোগুলো প্রানহানি করা হয়। আমরা চাই এই বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়।”
দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী সোহেল খান বলেন-“ঈদের বেশ কয়েকদিন আগে আমরা ভাসমান সেতুটি পরিদর্শন করি। এরপর এটি মেরামতের জন্য আমরা ১২ মার্চ টেন্ডার আহ্বান করি। ঈদের ছুটি চলে আসায় আমরা মেরামতের কাজ করতে পারিনি। তবুও আমরা সেতুটি প্রবেশ মুখে পোস্টার টানায়। পোস্টারে উল্লেখ ছিলো যে- সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়াও আমরা এই সেতুটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যাতে কেউ যাতায়াত করতে না পারে। ঈদের আগের দিন রাত পর্যন্ত সেতুর সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলো এবং আমাদের পোস্টার বা সাইনবোর্ড ছিলো। ঈদের দিন ভোরে কে বা কাহারা এই সংযোগ পুন:রায় চালু করে।”
এসব বিষয়ে একই কথা বলেন দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মুরাদ হোসেন। মুরাদ হোসেন বলেন-“বেশ কয়েক দিন যাবত সেতুটি বন্ধ ছিলো। ঈদের দিনভোর পর্যন্ত সংযোগ বন্ধ ছিলো। কে বা কারা সংযোগ চালু করে। এরপরই এই র্দূঘটনা ঘটে। এখন তদন্ত কমিটি তদন্ত করে পুরো বিষয়টি উদঘাটন করবে।”
তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ.কে.এম. আব্দুল্লাহ বিন রশিদ মোবাইল ফোনে বলেন- “সাত র্কম দিবসের মধ্যে আমাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ঘটনার সময় রাতেই আমরা সরেজমিনে গিয়েছিলাম। এছাড়াও আগামী রোববার আমরা আবারো সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করবো। সকল তদন্ত শেষে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে। তদন্তে প্রতিটি বিষয় তুলে ধরা হবে।”
জামালপুরের জেলা প্রশাসক মো. ইউসুপ আলী জানান- তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন